বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্যরক্ষায় মাস্ক

কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলাম :

সাধারণতঃ ধুলাবালি ও ধোঁয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হয়। আর এইসব ধুলাবালি ও ধোঁয়া আসে ইটভাটা (ব্যবহৃত নি¤œমানের কয়লা যেখানে সালফারের পরিমাণ ৭ থেকে ১০ শতাংশ অথচ এর পরিবেশ সম্মত সর্বোচ্চ সীমা হচ্ছে ১ শতাংশ) যানজট, পুরোনো মোটরগাড়ি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এবং ইট বালি উম্মুক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবহনের কারণে। রাস্তার দুইপাশ উন্মুক্ত মাটির হওয়ায় এবং সিসাযুক্ত পেট্রোল আমদানি ও দুইস্ট্রোকবিশিষ্ট ইঞ্জিনের কারণেও বায়ুদূষণ বহুলাংশে বেড়েই চলেছে। আর এই বায়ুদূষণের কারণে নগর কিংবা পল্লী সর্বত্র অসহনীয় হয়ে উঠছে জীবন। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকায় বায়ুদূষণ মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের চেয়ে পাঁচগুন বেশী। প্রতি কিউবিক মিটারে এয়ারবোর্ন পার্টিকুলেট ম্যাটারের (পিএম) পরিমাণ ২৫০ মাইক্রোগ্রাম। আর সহনীয় মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। শুধু এখানেই শেষ নয়। আমাদের পল্লী কিংবা শহরে গৃহস্থালী রান্নাবান্নার এক বড় উৎস কাঠকয়লা। এই কাঠকয়লার ধোঁয়াও পরিবেশ দূষণ ও সুস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকিস্বরুপ। আইসিডিডিআর বি’র এক গবেষণা মতে, রান্নাঘরের এই ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট ঝুলে থাকে নানা রকম দূষক কণা যা অ্যাজমা, অ্যালার্জি, সিওপিডি (ক্রণিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারী ডিজিজ) এর মতো মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা (হেলথ্ ডিস্অর্ডার) দেখা দেয়। কাঠকয়লার চুলার ধোঁয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণের প্রভাবে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশের বেশী স্বাসতন্ত্র ও হৃদযন্ত্রের ঝুঁকিতে। এই সমস্যা থেকে রক্ষার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং জিআইজেড (মরু-উবঁঃংপযব এবংবষষংপযধভঃ ভড়ৎ ওহঃবৎহধঃরড়হধষব তঁংধসসবহধৎনরবঃ-এওত, এসনঐ) সহ আরো কয়েকটি সংস্থা বন্ধু চুলা ব্যবহারের জন্য জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। এই চুলার নির্মাণ খরচ খুবই কম এবং কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ সহজ। বন্ধু চুলা ব্যবহারের সুবিধা হলো-প্রচলিত চুলার তুলনায় অর্ধেক জ্বালানী কম খরচ হয়। রান্নাঘর ধোঁয়া, কালি, ঝুলমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখে। ফলে চোখ জ্বালা, হাঁপানী, মাথাব্যথা ও ক্যান্সারের মত রোগের ঝুঁকি কমায়। ডব্লিউ এইচওর চলতি বছরের বিশ্ব ক্যান্সার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের মূল কারণের মধ্যে রয়েছে ধুমপান, সংক্রমণ, অ্যালকোহল, স্থুলতা ও কর্মবিমূখতা, তেজস্ক্রিয়তা (সূর্য এবং চিকিৎসার্থে স্ক্যান উভয় উৎস থেকে), বায়ুদূষণ ও অন্যান্য পরিবেশগতকারণ।

বায়ুদূষণের আরেকটি বড় কারণ শিল্পবর্জ্য ও অনিয়ন্ত্রিত পলিথিন ব্যবহার। আজকাল উচ্চ মাত্রায় অপচন ও অগলনশীল পলিথিন ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন চিপস্, বিস্কুট ও অন্যান্য প্যাকেটজাতকরণে। এই সকল পলিথিন দিনের পর দিন বাতাসে উড়ে ধুলাবালি ও এয়ারবোর্ন প্যাথোজেনের মাত্রা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া আমাদের অভ্যাসগত ও দায়িত্ববোধের অভাবেও বায়ুদূষণ ঘটছে। যেমন- শুষ্ক বায়ূতে ঘরের ফ্যান চালিয়ে ঝাড়– দেওয়া, ঝাড়– দেওয়ার সময় পানি ছিটিয়ে না দেওয়া, ইটপাথরের কাজে ত্রিপল ব্যবহার না করা, সিটিকর্পোরেশনের ঝাড়–দারদের রাতের বেলা ঝাড়– না দেওয়া ইত্যাদি। তাই বায়ুদূষণের বিষয়টাকে সামগ্রিকতা নিয়ে সকলকে ভাবতে হবে। ১৭৮৭ সালে দুষণ রোধে প্যাট্রিক গ্রিস পরিকল্পনা করেছিলেন। আর আজও আমরা পরিকল্পনা করেই যাচ্ছি। এই পরিকল্পনায় দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাচেতনা আমুল পরিবর্তন আনতে হবে। তবেই বায়ুদূষণ রোধ করা সম্ভব হবে।

দুই

বায়ুদূষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সকলের মাস্ক ব্যবহার করা প্রয়োজন। রাস্তায় বের হলেই নাক ও মুখ ভালোভাবে ঢেকে নেওয়া উচিত। হতে পারে সেটি তোয়ালে, গামছা, রুমাল, ওড়না কিংবা শাড়ীর আঁচল। আবার অনেকেই ফুল শার্টের হাতা দিয়েও নাক চেপে ধরেন। আবার কেউ কেউ হাতের পাঁচ আঙ্গুল দিয়েও নাক ও মুখ ঢাকার চেষ্টা করেন। এ সবই হল মাস্ক। বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক এর কোন বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে মাস্ক ফাউন্ডেশন (২০০৮ই) সোস্যাল মটিভেশনাল ওয়ার্ক হিসেবে ফ্রি মাস্ক বিতরণ, মোবাইল ম্যাসেজিং, এ্যাডভারটাইজমেন্ট, মাস্ক ইউজার স্টাবলিশিং এর কাজ নিরলসভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। মোবাইল ম্যাসেজিং এর মাধ্যমে মাস্ক ফাউন্ডেশন মূলতঃ চারটি কারণে মাস্ক ব্যবহার করার জন্য সকলকে উৎসাহিত করছে- ১। মাস্ক ডাস্ট ও পয়জন থেকে; ২। পোলেন গ্রেইন থেকে; ৩। শীতকালে কুয়াশা ও তুষার থেকে ফুসফুসকে; ৪। পৌরবর্জ্যরে দূর্গন্ধ থেকে ব্যবহারকারীকে রক্ষা করে। বাজারে বিভিন্ন রকমের মাস্ক পাওয়া যায়। সিঙ্গেল লেয়ার থেকে ডাবল লেয়ার মাস্ক বেশী কার্যকরী। সিনথেটিক মাস্কের চেয়ে সুতি কাপড়ের মাস্ক ভাল। তবে সতর্ক থাকতে হবে, মাস্কের ইয়ার লূপ যেন টাইট না হয়। একই মাস্ক অন্যজনে ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। মাস্ক যদি ওয়ান টাইম না হয়, তাহলে পরিস্কার করে বার বার ব্যবহার করা যায়।

Leave a Comment