পোকাদমনে জৈবিক ব্যবস্থার গুরুত্ব

কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলাম ::

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, লসবেনস, ফিলিপিনসের একদল গবেষক বি এম শেপার্ড, এ টি বারিয়ন এন্ড জে এ লিটসিঙ্গার তাদের রিসার্চ রিপোর্টের ভূমিকায় বলেছেন, ধানের বিভিন্ন অনিষ্টকারী পোকার প্রজনন ক্ষমতা এতো বেশি যে প্রাকৃতিকভাবে তারা যে হারে মারা যায়, তারচেয়ে অনেক দ্রুত হারে তারা তাদের বংশবৃদ্ধি করতে পারে। শেপার্ড ও তার সহযোগীরা সেই রিসার্চ রিপোর্টে আরো দেখিয়েছেন- একটি স্ত্রী বাদামি গাছফড়িং থেকে একটা প্রজন্মে প্রচুর সংখ্যায় বাচ্চা জন্ম নেয় কিন্তু এক প্রজন্মের পর তাদের মধ্যে মাত্র ১-২ টা বেঁচে থাকে। কারণ গাছফড়িং এর অধিকাংশ প্রজন্মকে পরভোজী পোকামাকড় খেয়ে ফেলে অথবা পরজীবী পোকা ও রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এভাবে পরভোজী ও পরজীবী পোকা এবং রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ৯৮-৯৯ শতাংশ অনিষ্টকারী পোকা মারা যাওয়া অসম্ভব নয়। প্রকৃতিতে যদি এ সমস্ত উপকারী পোকামাকড় ও রোগজীবাণু না থাকতো তাহলে অনিষ্টকারী পোকার সংখ্যা এতো দ্রুত বেড়ে যেত যে তারা ধানক্ষেতের সমস্ত ফসল খেয়ে নষ্ট করতো। কিন্তু প্রকৃতি নিজেই তার নিজের সৃষ্টিকে ভারসাম্য রক্ষা করবার ক্ষমতা দিয়েছে। এই প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে আমরা আধুনিক কৃষির নাম ভাঙ্গিয়ে মূলত রাসায়নিক কৃষির দাপটে অনেকটা অস্থির করে তুলছি। না জেনে না শুনে অযথা অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও বিষ প্রয়োগের ফলে ফসলের পক্ষে উপকারী পোকামাকড় ও প্রাণীকূল ধ্বংস করে বিষিয়ে তুলছি কৃষি পরিবেশ ও প্রতিবেশ তথা হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে সমস্ত কৃষি ও আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। তাই জীবন বাঁচানোর তাগিদে জৈবকৃষিতে আজ পোকা দ্বারা পোকাদমন বা পোকাদমনে অন্যান্য জৈবিক ব্যবস্থার চর্চা আশু প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই.

অনিষ্টকারী পোকামাকড় দমনের জন্য আমাদের জৈবিক দমনের উপাদানসমূহ জানতে হবে- চিনতে হবে। আমরা যদি শুধুমাত্র ধান চাষের প্রতিও খেয়াল করি তবে দেখতে পাই- উপকারী পোকামাকড়, রোগজীবাণু, পাখী এবং আরো কিছু মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী প্রাণী সবসময় অনিষ্টকারী পোকার উপর এক বিরাট খাদ্যশৃঙ্খল বা ফুড চেইন তৈরি করে। যেমন- ব্যাঙ, পেঁচা, চিল, মাছরাঙা, গুইসাপ, মাকড়সা, লেডিবার্ড বিটল, ক্যারাবিড বিটল, গ্রাউন্ড বিটল, ড্যামসেল ফ্লাই, ওয়াটার বাগ, মিরিড বাগ, উলফ স্পাইডার, বোলতা, পিঁপড়ে ইত্যাদি উপকারী পোকা ও পাখী মিলে ক্ষতিকর পোকাকে আক্রমণ করে অথবা শিকার করে খায়। তাই জৈবকৃষির স্বার্থেই এগুলো সংরক্ষণ এবং প্রতিপালন করা জরুরি প্রয়োজন। এই সমস্ত প্রাকৃতিক উপাদান খাদ্যশৃঙ্খল বা ফুড চেইনে প্রাকৃতিক ভাবেই অবস্থান করে এবং এদের শিকার ধরবার কলাকৌশলও ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হয়। কিছু কিছু পরভোজী পোকা যেমন- লেডিবার্ড বিটল, ঘাসফড়িং ও উড়চু্ঙ্গা অনিষ্টকারী পোকার ডিম খেতে পছন্দ করে। ওয়াটার বাগ পানির উপর সাঁতার কাটে বা পানির উপরিভাগে অবস্থান করে। ধানক্ষেতের অনিষ্টকারী পোকামাকড় যখন একস্থান থেকে অন্যস্থানে যায় অথবা পানির উপর পড়ে যায় তখন ওয়াটার বাগ সেগুলো ধরে খায়। ধানক্ষেতের আর একটি বড় সমস্যা হলো পাতামোড়ানো পোকা। গ্রাউন্ড বিটল পাতামোড়ানো পোকার লার্ভা বা কীড়া খেতে খুব পছন্দ করে। প্রতিটি গ্রাউন্ড বিটল দিনে ৩-৫ টা লার্ভা বা কীড়া খায়। পূর্ণবয়স্ক গ্রাউন্ড বিটল ধানের বাদামি গাছফড়িং এবং সাদা পিঠ গাছফড়িংও খায়। আমাদের বহুল পরিচিত বোলতা ও পিঁপড়া। বোলতার কীড়া প্রতিদিন পাতাফড়িং ও গাছফড়িং এর ৪-৮ টা ডিম খায়। লাল বা লালচে ধূসর রঙের পিঁপড়া শুকনো ধানক্ষেতের মধ্যে বা ভেজা ধানক্ষেতের আইলে বাসা তৈরি করে। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এরা বাসা থেকে অনেক দূরে শিকার খুঁজে বেড়ায়। এরা বহু ধরণের পোকামাকড় ও জীব শিকার করে খায়। এমনকি ব্লাকবাগের মতো বড় বড় পোকাকেও এরা আক্রমণ করে। উপকারী পোকা কর্তৃক অনিষ্টকারী পোকার উপর এই যে আক্রমণ বা শিকার ধরবার প্রকৃতি ও কৌশল তা জানা এবং উপকারী পোকা চেনা ও সংরক্ষণ করা ছাড়া জৈবকৃষির সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

তিন.

সম্প্রতি এদেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যমতে, পোকামাকড়, রোগজীবাণু, আগাছা, নেমাটোড বা কৃমি, ইঁদুর, পাখী ইত্যাদির আক্রমণে ধানের ১৬ শতাংশ ফলন কমে যায়। আর সবজীর ক্ষেত্রে এই ফলন কমে যাওয়ার মাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ শতাংশে। এই হার কিছুটা কমিয়ে আনতে জৈবকৃষিতে ব্যাঙ চাষের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। আপনি প্রশ্ন ছুড়তেই পারেন- কৃষির এই আধুনিক স্বর্ণ সময়ে কেন আবার সেই মান্ধাতার আমলে ফিরে যাওয়া ? কারণ, অতিমাত্রার রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ফসলী মাঠের মাটি-পানি-বাতাস বিষাক্ত হওয়ায় ব্যাঙ-চ্যাঙ, কেঁচো-কুচো, মাছ-গাছ মরে পচে সাবাড়। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। ব্যাঙ ডাকছে না, মাছ ভাসছে না, কেঁচো গর্ত করছে না। তাই ব্যাঙ পরিকল্পনায় সরকারকে গচ্ছা গুনতে হচ্ছে ৫৯ কোটি টাকা। আমরা অনেক আগেই কেঁচো চাষ (ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি) শুরু করেছি। মাছ এখন সৌখিন পুকুরপালিত আমিষ ফসল। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বিষে নালা খাল ডোবা পুকুরে মাছের ডিম ফুটানো তো দূরের কথা সেখানে মাছের প্রজননও সম্ভব হয় না। শামুক ঝিনুকের দেখা পাওয়া ভার। তবে জৈবকৃষির জন্য আশার বার্তা এই যে, সম্প্রতি ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার এক্সটেনশন বা ডিএই ৯৭ হাজার ৫০০ চাষিকে প্রায় ৪ হাজার সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ক্লাব বা ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট অর্থাৎ আইপিএম ক্লাবের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে বালাইনাশকের ব্যবহার শতকরা ৮০-৯০ ভাগ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনা সফল হলে কৃষি চর্চায় জীব বৈচিত্র্য যেমন রক্ষা হবে, তেমনি ধান ও সবজির ফলন ১৫ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা যায়। কৃষিতে জৈবিক ব্যবস্থা সংরক্ষণে মেহগনি বা নিমের নির্যাস, ফেরোমন ট্র্যাপ, আলোক ফাঁদ, হ্যান্ড পিকিং, নেটিং, ট্রাইকোডার্মা ইত্যাদি ব্যবহারের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে এবং চাষীর দৃষ্টিভঙ্গিতেও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

চার.

আমরা কৃষিতে জৈবিক ব্যবস্থার এই যে বুলি আওড়াচ্ছি তার অনেকটায় কাজে আসে না শুধুমাত্র চাষির অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অবিশ্বাসের কারণে। টিকসই কৃষিতে জৈবিক ব্যবস্থার চর্চা করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। অতঃপর কীটনাশকের করাল বলয় থেকে বেরিয়ে আসবার দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মবিশ্বাস। কেননা, জৈব কৃষিতে প্রকৃতির মমতায় বেড়ে ওঠে ফসলের ক্ষেত, সেখানে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগে বিষাক্ত ফসল ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করবার কোন সুযোগ নেই। সে কারণে, ফসল তেমন উজ্জল রং ছড়ায় না- আকার আকৃতিতেও তেমন সুন্দর দেখায় না। জৈবকৃষির প্রচলন ও চাষির সচেতনতা বাড়াতে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষি সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে এবং জৈব সহায়ক বিভিন্ন কর্মসূচী অব্যাহত রেখেছে। ডিএই পরিচালিত আইপিএম ক্লাবের মাধ্যমে চাষিদের জৈবকৃষির প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে উপকারী ও অনিষ্টকারী পোকা চেনানো এবং এদের প্রয়োগ পদ্ধতি শেখানো হয়। কিন্তু প্রশিক্ষিত চাষি পরবর্তীতে ঐসব জৈব পদ্ধতি মাঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রয়োগ করে না। প্রয়োগ না করার কারণও ব্যাপক। তবে প্রধান কারণ হলো- জৈবিক ব্যবস্থায় উৎপাদিত ফসল, কীটনাশক বা বিষ প্রয়োগে উৎপাদিত ফসলের কাছে দামের প্রতিযোগীতায় টিকতে না পারা। শুধুমাত্র জৈব ফসলের উপযুক্ত দাম, কোন কোন ক্ষেত্রে উচ্চ দাম নিশ্চিত হলেই চাষিরা ফসল উৎপাদনে জৈবিক ব্যবস্থাকে অতি উৎসাহী হয়ে গ্রহণ করবে। আবার উচ্চ দামে কেনার ইচ্ছা থাকলেও ক্রেতাসাধারণ বিষাক্ত ও জৈব ফসল চিনতে পারে না। আপাতদৃষ্টিতে চেনার কথাও নয়। এখন পর্যন্ত জৈবিক ব্যবস্থায় উৎপাদিত ফল ও সবজি বাজারে মনিটরিং করার সুযোগ ও ব্যবস্থা কোনটিই নেই। নেই কোন আলাদা দোকান, সুপার শপ, হাট কিংবা বাজার যেখানে শুধু জৈব সবজি ও ফল কেনাবেচা হয়। আবার, জৈব চাষে ফসল উৎপাদন করা এবং তা বাজারজাতের জন্য নির্ভরযোগ্য কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এখনো আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। অনেক সময় অসাধু বিক্রেতা আম-লিচুর ক্ষেত্রে ‘বিষমুক্ত’ শব্দটির নাম ভাঙ্গিয়ে ক্রেতার সাথে প্রতারণা করে থাকে। এতে জৈব খাদ্যের প্রতি ক্রেতার আগ্রহ তেমন থাকে না।

পাঁচ.

জৈবকৃষি শুধুমাত্র চাষির স্বাস্থ্য সুরক্ষাই করে না বরং সমস্ত প্রতিবেশ বা ইকোসিস্টেমের সুরক্ষা দেয়। দেয় টিকসই পরিবেশের নিশ্চয়তা। তারপরও আইপিএমের সর্বশেষ ধাপ হিসেবে ইকোনোমিক থ্রেসহোল্ড লেভেলে আমাদেরকে কীটনাশকের আশ্রয় নিতেই হয়। তবে এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য মেনে চলতে হয় কিছু নিয়মকানুন। কীটনাশকের সরাসরি সংস্পর্শও স্বাস্থ্যের জন্য কোন অংশে কম ক্ষতিকর নয়। According to PennState Extension of Pennsylvania State University, ‘From the blood capillaries of the lungs, toxic substances are rapidly transported throughout the body. The key to preventing respiratory hazards associated with a pesticide application is to wear a respirator. Respirators protect applicators from inhaling airborne chemicals or dusts that may cause temporary or permanent harmful health effects, including death.’ তাই কীটনাশক প্রয়োগের সময় ব্যক্তিগত সুরক্ষাকারী উপাদান বা পারসোনাল প্রটেকটিভ ইক্যুয়েপমেন্ট (পিপিই) হিসেবে মাস্ক বা রেসপিরেটর, গ্লাভস, ফেসশিল্ড, রেইনকোর্ট বা অ্যাপ্রোন অথবা ঢিলেঢালা ফুল শার্ট প্যান্ট, গামবুট ইত্যাদি দ্বারা নিজেকে সুরক্ষিত করে ফসলে স্প্রে করা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে, ‘সারাবিশ্বে প্রতি বছর ৩০ লাখ মানুষ কীটনাশকজনিত কারণে মারা যায়’। জৈবকৃষি প্রচলনের সাথে সাথে কীটনাশকের তীব্রতা ও ব্যবহার কমিয়ে আনা, স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে কীটনাশক এড়িয়ে চলা এবং ফার্ম ডাস্ট, পোলেন গ্রেইন, মোল্ড স্পোর ইত্যাদি থেকে শ্বাসতন্ত্রকে রক্ষা করতে রেসপিরেটরি প্রটেকটিভ ইক্যুয়েপমেন্ট (আরপিই) হিসেবে মাস্ক বা রেসপিরেটর ব্যবহার করা অতি জরুরি। স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেমন- কীটনাশক প্রয়োগে ও ধুলাবালি থেকে রক্ষা পেতে এবং স্বাস্থ্যের প্রতি অধিক যত্নশীল করতে মাস্ক ফাউন্ডেশন (২০০৮ ইং) মাস্ক ব্যবহারের জন্য চাষীদেরকে সচেতন করছে। প্রকারান্তরে, মাস্ক ফাউন্ডেশন ‘টেক মাস্ক সেভ লাং’ স্লোগানের মাধ্যমে কীটনাশক এড়িয়ে চলতে এবং পোকাদমনে টিকসই জৈবকৃষি ব্যবস্থার প্রতিই ইঙ্গিত করে।

Leave a Comment