স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধে বন্ধুচুলা

কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলাম ।।

স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য দায়ী বিভিন্ন প্রকার দূষককণা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। বায়ুবাহিত এসব দূষককণার মধ্যে ধুলাবালি, গাড়ির কালো ধোঁয়া, পুস্পরেণু, মোল্ড স্পোরস, পেট ডেনডার, মাইটসের মল, এরোসল, মশার কয়েল-আগরবাতি-চুলার ধোঁয়া অন্যতম। এসবের মধ্যে চুলার ধোঁয়া হলো অভ্যন্তরীণ দুষককণা যা রান্নাঘরের অভ্যন্তর তীব্রভাবে দূষিত করে। ফলে রান্নার কাজে নিয়োজিত একজন গৃহিণীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে চলার সাথে সাথে শিশুরাও চুলার ধোঁয়াজনিত দূষককণার শিকার হয়। ধোঁয়ার শিকার হয় শ্বাসকষ্টের রোগী, বৃদ্ধসহ সকলে। কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ড: বিয়ন লোমবোর্গ জানিয়েছেন, ‘বাড়ির ভেতরে খোলা আগুনে রান্নার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তা এক দিনে দুই প্যাকেট সিগারেট ধূমপান করার সমপরিমাণ হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি ১০টি বাড়ির মধ্যে প্রায় ৯টি বাড়ি অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণের শিকার’। অথচ আমরা চুলার ধোঁয়ায় সৃষ্ট হেলথ ডিজঅর্ডার বা স্বাস্থ্যসমস্যার বিষয়ে তেমনটা জানি না আর জানলেও অনেক সময় মানি না।

আমাদের জন্য আর একটি প্রধান সমস্যা হলো- প্রচলিত কাঠকয়লার চুলাগুলোর অধিকাংশ শোবার ঘর বা মাস্টার রুমের সাথে তৈরি করা হয়। আবার এসব চুলার কোন কোনটি উম্মুক্ত এবং শোবার ঘর থেকে অনেকটা দুরে- যেগুলোতে ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ কম থাকে। আবার অধিকাংশ চুলা রান্নাঘরের অভ্যন্তরে এবং সেসব ঘরে আলো বাতাস ঢোকবার কিংবা উৎপন্ন ধোঁয়া বেরিয়ে যাওয়ার কোন প্রশস্ত দরজা জানালা নেই। পল্লীগ্রামে অতি দরিদ্র এমন অনেক ঘর আছে যেখানে রান্নার ঘর এবং শোবার ঘর বলতে একত্রে বুঝায়। ফলে দীর্ঘদিন রান্না করায় রান্নাঘর ও শোবার ঘরে দূষককণার পরিমাণ বাড়তে বাড়তে আরো চরমরূপে আকার ধারণ করে। আর দেখা দেয় সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্যসমস্যা বা এ্যকুট এন্ড ক্রণিক হেলথ ডিজঅর্ডার। বিশেষ করে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা করা, দৃষ্টিশক্তির অবনতি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি বা অ্যাজমা, অ্যালার্জি, নাক-গলা-ফুসফুসের প্রদাহ, ক্রণিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি, আলসার, ক্যানসার এমনকি ধোঁয়ার এসব দূষককণা ফুসফুসের টিনি এয়ারস্যাকের মাধ্যমে রক্তরসে প্রবেশ করে কিডনি ড্যামেজ, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ, কোমা এবং মৃত্যুও হতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়া ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ বা আইসিডিডিআর,বি’র ২০১২ সালে করা এক রিপোর্ট অনুসারে, প্রচলিত কাঠ কয়লার চুলার ধোঁয়া এবং উৎপন্ন দূষককণার প্রভাবে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশের বেশি শ্বাসতন্ত্র ও হৃদযন্ত্রের ঝুঁকিতে। সুস্বাস্থ্যের প্রশ্নে এই সংখ্যা আমাদের জন্য চরম উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বিষয়। অন্য এক রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০১৩ সালেই রান্নাঘরের প্রচলিত চুলার ধোঁয়ার কারণে বাংলাদেশে হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা ২৫ লাখ ছাড়িয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ধোঁয়া ও দূষককণার প্রভাবে ৫০ হাজারের বেশি মা ও শিশু মারা গেছে। সবচেয়ে বেশি মারা গেছে শিশুরা। বন্ধুচুলার ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে ধোঁয়াজনিত শিশু মৃত্যুহার প্রায় ৫০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব। গর্ভবতী মা এবং বৃদ্ধরাও চুলার ধোঁয়ায় সহজে আক্রান্ত হয়। তাই রান্নাঘরের ধোঁয়াদূষণ কমাতে তথা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বন্ধুচুলা বা ইমপ্রুভড কুক স্টোভের কথা ভাবতে হবে।

আমাদের অনেকের কাছে ‘বন্ধুচুলা’র ধারণাটা এখনো সুস্পষ্ট নয়। ব্যাপক প্রচারের অভাব ও অসচেতনতা, অভ্যাস পরিবর্তনে অনীহা এবং চুলা ক্রয়ে সামান্য অর্থের যোগান এর জন্য দায়ী। প্রথমে আসি বন্ধুচুলা কি ? সাধারণ ইট, বালি ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বন্ধুচুলা দেখতে অনেকটা সাধারণ চুলার মতোই তবে এর নির্মাণশৈলীতে একটি ছাঁকনি ও ধোঁয়া বহির্গমন নল বা চিমনি থাকে। চিমনি বা ডেলিভারি পাইপ দিয়ে রান্নার চুলায় উৎপন্ন ধোঁয়া সহজেই বাহিরে যায়। পাইপের শেষপ্রান্তে থাকে একটি টুপি বা ক্যাপ যা ধোঁয়ার কার্বন কণাকে কিছুটা ধরে রাখে। ফলে বাতাসে কার্বন সংমিশ্রণের পরিমাণ অনেকটা কমে যায়। প্রতিটি বন্ধুচুলা থেকে যে পরিমাণ গ্রীণ হাউজ গ্যাস বা জিএইচজি বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয় তার থেকে ১.৭ টন পরিমাণ জিএইজি নিঃসরণ কম হয় যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ন হ্রাসে বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বন্ধুচুলা সাধারণত একমুখী, দ্বিমুখী, ত্রিমুখী বা বহুমুখী হতে পারে। আবার প্রয়োজন ও গ্রাহকের চাহিদা অনুসারে বিভিন্ন আকার আকৃতিতে তৈরি করা যায়। মোটকথা, এতে ক্ষতিকর ধোঁয়া নিঃসরণকারী পাইপ থাকা জরুরী। শুধুমাত্র পারিবারিক কাজেই নয়, বন্ধুচুলার ব্যাপক ব্যবহার বাড়াতে হবে। যেমন- চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ছাত্রাবাস, পুলিশ ফাঁড়ি, সেনানিবাস, হোটেল-রেস্তোরায়ও বন্ধুচুলার আবশ্যিক ব্যবহারে তদারকি বা মনিটরিং করা উচিত।

বন্ধুচুলার আর একটি সুবিধা হলো- এতে জ্বালানি খরচ অনেক কম হয়। তাপের অপচয় কম হয় বলে রান্না দ্রুত হয় এবং সময় সাশ্রয়ী। আর জ্বালানি খরচ যেহেতু কম হয়, সেহেতু বছরে প্রায় ৭০ কোটি টন জ্বালানি কাঠ সাশ্রয় সম্ভব যেখানে ১৪০ কোটি টন জ্বালানি কাঠ রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে একদিকে সবুজ বনানী জ্বালানির হাত থেকে রক্ষা পাবে, অন্যদিকে লতা-পাতা, খড়-কুটা মাটিতে যোগ হয়ে মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ হবে এবং মাটির প্রতিবেশ বা সয়েল ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা পাবে।

যদিও বন্ধুচুলা রান্নাঘরে অনেক কম ধোঁয়া ছড়ায় তথাপি একেবারে ধোঁয়া ছড়ায় না একথা বলা যাবে না। তাই জ্বালানি বা লাকড়ি পুরোপুরিভাবে শুকনো হতে হবে। ধোঁয়া এড়িয়ে চলতে নিরাপদ দূরত্বে বসে রান্না করা উচিত। রান্নার চুলা যদি খোলা জায়গায় হয় তবে বাতাস যেদিক দিয়ে আসে তার বিপরীতে বসে রান্না করা উচিত। আর সম্ভব হলে নাকেমুখে মাস্ক পরা ভালো। মাস্ক হলো কাপড়ের তৈরি নাকমুখ ঢাকবার উপাদান যা ফিতা (ইয়ার লুপ বা হেড স্ট্রাইপ) দ্বারা কানে বা মাথায় জড়ানো/পরা হয়। একপর্দাবিশিষ্ট কানে পরা কাপড়ের মাস্কই আমাদের দেশে সচরাচর পাওয়া যায়। উন্নত দেশে বিভিন্ন ধরণের ডাস্ট মাস্ক ও গ্যাস মাস্ক পাওয়া যায়। আমরা মাস্কের সাথে পরিচিত না থাকলে অথবা হাতের নিকট মাস্ক না পাওয়া গেলে পরিষ্কার কাপড়, শাড়ির আঁচল বা ওড়না দিয়ে নাকমুখ ভালভাবে ঢেকে নিতে হবে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কিছুটা কম হবে।

Published in :

Weekly Gonochetona

Dated : 25-06-2016

Leave a Comment