বায়ুজাত দূষককণা এবং আমাদের মাস্কচেতনা

কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলাম ।।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) রিপোর্ট অনুসারে, প্রতিবছর পৃথিবীর ১.৩ মিলিয়ন বা ১৩ লক্ষ মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মারা যায়। আবার, ইউরোপের বড় বড় শহরে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার মানুষ ফুসফুসের ক্যানসার ও হার্ট অ্যাটাকে প্রাণ হারায়, যার অন্যতম কারণ ধুলাবালি ও গাড়ির কালোধোঁয়া। অতিসম্প্রতি আমেরিকান লাং এসোসিয়েশন এক রিপোর্টে (২০ এপ্রিল ২০১৬) উল্লেখ করেছে, ‘ About 166 million Americans (52.1 percent) are at risk from health effects of unhealthy air and puts more than half of all Americans at risk for premature death and other serious health effects like lung cancer, asthma attacks, cardiovascular damage and developmental and reproductive harm. ‘ বায়ুজাত দূষককণা আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য কতোটা দায়ী তা গবেষণালব্ধ এই রিপোর্ট থেকে সহজেই অনুমেয়। আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় এই যে, জাতিসংঘের এক রিপোর্ট (২০০৯) অনুসারে, শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ধুলাবালি ও ধোঁয়ার কারণে বছরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার। আর আমরা রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বায়ুজাত দূষককণা বা এয়ারবোরন পার্টিকেল ম্যাটার বা এয়ারবোরন প্যাথোজেন দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের রোগী, শিশু ও বৃদ্ধরা। কারণ, এদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইম্যুনো এবিলিটি সবচেয়ে কম থাকে। আমেরিকান লাং এসোসিয়েশনের ঐ রিপোর্টের উপসংহারে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘ Everyone has the right to breathe healthy air. That’s why the American Lung Association has been fighting for healthy air since before the Clean Air Act was signed in 1970’.

আসুন, আমরা স্বাস্থ্যসমস্যায় বায়ুজাত দূষক কণাগুলোর সাথে পরিচিত হই ::

ধুলাবালি :: ইউনাইটেড স্টেট এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সির(ইউএস ইপিএ) গবেষণা মতে, উম্মুক্ত মাটির রাস্তা ধুলাবালি সৃষ্টির প্রধান উৎস। আর যেহেতু আমরা রাস্তায় অধিক সময় ব্যয় করি সেহেতু আগে প্রয়োজন রাস্তার ধুলাবালি ব্যবস্থাপনা। আমাদের দেশে অধিকাংশ রাস্তা মাটির তৈরি। যদিও কিছু হাইওয়ে এবং পাকা সাইড রোড আছে তথাপি রোডের কিনারা উম্মুক্ত কাঁচা মাটির ; ফলে দ্রুতগামী যানবাহন আরো বেশি ধুলাবালি সৃষ্টি করে। হাইওয়ে এবং পাকা রাস্তার পার্শ্ব বা কিনারা পর্যন্ত পাকা করতে হবে এবং স্লোপ বা ঢালুতে গ্রাস লন বা ঘাস দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। রাস্তার পাশে কোন প্রকার নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখা যাবে না। মাটি বা বালিবাহিত ট্রাকে অবশ্যই ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দিতে হবে ; সেই সাথে সকল প্রকার যানবাহনের চাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছাড়া হাইওয়ে ও পাকা রাস্তায় চলাচল নিয়ন্ত্রণ করলে ধুলাবালি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কাঁচা রাস্তায় গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কাঁচা রাস্তা এবং কৃষি চাষবাস ওয়েট কন্ডিশন বা ভেজানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, ধুলাবালির সূক্ষ্মকণাগুলো এই দুই উৎস থেকেই সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হয়। সূক্ষ্মতানুসারে, ধুলিকণা দুই প্রকার ; বড়কণা বা করেজ পার্টিকেল >২.৫~১০ মাইক্রণ আর ছোটকণা বা ফাইন পার্টিকেল <২.৫ মাইক্রণ। ইউএস ইপিএ ১৪ ডিসেম্বর ২০১২ সালে অন্য এক প্রতেবেদনে বলেছে, 'যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও আরিজোয়ানা স্টেটে কৃষি কাজের ফলে উৎপন্ন ধুলায় পিএম১০ দূষণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এই সমস্ত কণা শ্বাসের মাধ্যমে সহজেই ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে এবং সামান্য পরিমাণে রক্তেও প্রবেশ করে। ফলে হৃৎপিন্ড ও ফুসফুসের রোগসহ অকালমৃত্যু হতে পারে। শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় কয়েকগুণ'। আমাদের মনে রাখতে হবে, ধুলাবালির কারণে বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ১০ কোটি মানুষ শ্বাসনালীর সচরাচর সমস্যা তথা অ্যাজমা, অ্যালার্জিজনিত স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত। এই অর্থেও ধুলাবালি এড়িয়ে চলতে হবে এবং প্রাথমিক প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে সকলের মাস্ক পরা প্রয়োজন। গাড়ির কালোধোঁয়া :: গাড়ির কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। সাধারণত অপরিশোধিত জ্বালানি (যেখানে সালফারের পরিমাণ ১০ ভাগের বেশি), ইউরো গ্রেডের গাড়ি আমদানি না করে লক্কড় ঝক্কড় পুরাতন গাড়ি এবং নিয়মিত গাড়ির ইঞ্জিনের যত্ন না নেওয়ায় কালোধোঁয়ার সাথে বিভিন্ন প্রকার দূষিত গ্যাস যেমন- কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড প্রতিনিয়ত বায়ুতে মিশছে। আবার রাস্তার অব্যবস্থাপনা, খুবই কম গতিতে গাড়ি চালানো (ঢাকা শহরে কিংবা যানজটে) এবং দূর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় 'গাড়ি জ্যামে' জ্বালানির যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় কালোধোঁয়ায় দূষক পদার্থের পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। গাড়ির কালোধোঁয়া সূক্ষ্মকণা বা ফাইন পার্টিকেল (<২.৫ মাইক্রণ) বহন করে। এই ফাইন পার্টিকেল সাধারণ ডাস্ট মাস্ক দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব অক্যুপেশনাল সেফটি এন্ড হেলথ (NIOSH) কর্তৃক স্বীকৃত 'N95' বা এধরনের মাস্ক ফাইন পার্টিকেলে বেশি উপযোগী। ডাস্ট মাইটস :: ডাস্ট মাইটস হলো অর্থোপোড পর্বের মাইক্রোস্কোপিক ইনসেক্ট কিন্তু প্যারাসাইট নয়। এগুলো কামড়ায় না, চুষে খায় না ; মানবদেহের মরাকোষ খেয়ে বাঁচে। এখন আপনার প্রশ্ন হলো- এরা পানি খায় কি না ? আমেরিকান লাং এসোসিয়েশনের রিপোর্ট অনুসারে, 'Dust mites occur naturally and can appear in nearly all homes. They do not drink water like we do ; they absorb moisture from the air.' আবার Institute of Medicine, Washington, D.C. এর রিপোর্ট অনুসারে, 'Mites are one of the major indoor triggers for people with allergies and asthma'. মাইটসের মল বায়ুজাত দূষককণা হিসেবে আমাদের ফুসফুসেও প্রবেশ করে। সাধারণত ৫০% আর্দ্রতায় এরা জন্মে না, এয়ার কন্ডিশনের সাহায্যে এই আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়। মাঝেমাঝে ঘরের জানালা খুলে আলো প্রবেশ (৫০% আর্দ্রতার নীচে) করানো এবং গরম পানিতে বিছানাপত্র পরিষ্কার করা উচিত। সর্বোপরি, মাস্ক মাইটসের মল থেকে আপনাকে স্বস্তি ও সুরক্ষা দিতে পারে। পোলেন গ্রেইন :: পোলেন গ্রেইন হলো অতিসুক্ষ্ণ বা অাণুবীক্ষণীক অংগ বা পুষ্পকণা যা উদ্ভিদের পুং প্রজননতন্ত্রে অবস্থান করে। এই পোলেন গ্রেইন বাতাস, পানি, পতঙ্গ ইত্যাদি বাহকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্ত্রী প্রজননতন্ত্রের সংস্পর্শে এসে ফার্টিলাইজেশন ঘটায়। মাইক্রোস্কোপিক এয়ারবোরন পোলেন গ্রেইন বাতাসের পার্টিকেল ম্যাটারের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয়। Wendy McDougal এর মতে, ' Pollination sends millions of tiny pollen grains through the air, many of which end up in our nose and causes sneezing, watery eyes, nasal congestion, runny nose, itchy throat, cough, sore throat, hoarse voice etc. " আমাদের দেশে আকাশমণি গাছের পোলেন গ্রেইন বাতাসে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং শ্বাসকষ্ট, সিওপিডি ও অ্যাজমা রোগীদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য বাড়ির পাশে আকাশমণির গাছ না লাগানোই ভালো। আর যারা ফুলের চাষ করেন, বিশেষ করে ঘাসের পোলেন, গ্রামিনি ফ্যামিলির শস্য, যেমন- ধান, ভূট্টা শস্যে কাজ করেন- তারা যদি অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টের রোগী হয়ে থাকেন তবে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। ন্যাপথ্যালিন :: থ্যালিক এনহাইড্রাইড (phthalic anhydride) উৎপাদনে ন্যাপথ্যালিন ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে কাপড় সংরক্ষণে মেয়েরা অনেক সময় আলমারি, ওয়ারড্রব, ট্রাংক কিংবা কাঠের বাক্সের কোনায় অথবা সরাসরি কাপড়ে, কাপড়ের ভাঁজে ন্যাপথ্যালিন ট্যাবলেট রেখে দেন যাতে পিঁপড়া, আরশোলা, সিলভার ফিশ কাপড় নষ্ট না করে। এটি ভোলাটাইল হওয়ায় আস্তে আস্তে গ্যাস নিঃসরণ হয় এবং এক সময় নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু এই ন্যাপথ্যালিনও (by inhalation, ingestion and dermal contact) স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং স্বল্প মেয়াদি হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, লিভার এন্ড নিউরোলোজিক্যাল ড্যামেজ এবং দীর্ঘ মেয়াদি রেটিনা ড্যামেজও হতে পারে। ন্যাপথ্যালিন ব্যবহৃত পরিবেশে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। ন্যাপথ্যালিনের বিকল্প হিসেবে শুকনো নিমপাতা পলিপ্যাকে ভরে পলিপ্যাকের গায়ে অনেকগুলো ছিদ্র করে কাপড় সংরক্ষণের স্থানে রাখা যেতে পারে তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে নিমপাতা পরিবর্তন করতে হবে। মশার কয়েল :: মশা একদিকে রক্ত চুষে খায় অন্যদিকে ম্যালেরিয়া, ফাইলোরিয়া, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের বাহক বা ভেক্টর হিসেবে কাজ করে। ইউএস ইপিএ (ইউনাইটেড স্টেট এনভায়রণমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি) এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'Pests such as cockroaches, rodents and mosquitoes need food, water and shelter. Often, problems involving these pests can be solved just by removing these key items'. মশা তাড়াতে আমরা মশার কয়েল ব্যবহার করি। মশার কয়েলে থাকে ক্ষতিকর ডি-এলেথ্রিন, এস বায়োথ্রিন ও অন্যান্য অ্যাকটিভ ম্যাটেরিয়াল। চটকদার বিজ্ঞাপনে আমরা প্রায় শুনি, মশা মারতে আরো শক্তিশালী, আরো কার্যকরী। মনে রাখবেন, এই শক্তিশালী কয়েল আপনার জন্য আরো বেশি বিপদজনক। আবার, টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টে সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) এক গবেষণায় দেখা গেছে, 'আগরবাতি মিষ্টিগন্ধ ছড়ালেও এর ধোঁয়া খুবই অস্বাস্থ্যকর। কারণ, আগরবাতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান'। ধুপের ক্ষেত্রেও একই রকম স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে, আগরবাতি ও ধুপ যদি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়, সেক্ষেত্রে এগুলো পরিত্যাগ বা অ্যাভয়েড করা ঠিক হবে না। চুলার ধোঁয়া :: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউ এইচ ও) বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, 'বাংলাদেশে কেবল ২০০২ সালে জ্বালানিকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণে শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণের ফলে ৪৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। তাছাড়া প্রতিবছর বিশ্বে নিরেট জ্বালানির ক্ষতিকর প্রভাবে প্রায় ২০ (বিশ) লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এবং সব ধরণের রোগের মোট ব্যাপকতার ২.৭ শতাংশ হয়ে থাকে'। আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) তথ্যানুসারে, 'নিরট জ্বালানি রান্নার জায়গার চারপাশে ও সংলগ্ন থাকার ঘরে ঘনভাবে দূষক পদার্থ ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস সৃষ্টি করে যা মানুষের শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও হৃদরোগজনিত অসুস্থতা এবং মৃত্যুর অন্যতম 'রিক্স ফ্যাক্টর' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়'। আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় এই যে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ রান্না ও উত্তাপের জন্য নিরেট জ্বালানি (কাঠ-কয়লা, গোবরের ঘুটে, ধানের তুষ, খড়, কাঠের গুঁড়া, পাটকাঠি কিংবা বনপাতার জ্বালানি) ব্যবহার করে। ধোঁয়ার দূষক কণাগুলো ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং ব্লাডস্টিমের মাধ্যমে সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে চুলা ব্যবহারকারীর চোখ জ্বালা করা বা দৃষ্টিশক্তির অবনতি, নাক-গলা-শ্বাসতন্ত্র ও ফুসফুসের প্রদাহ, আলসার, ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, হৃদরোগ, অ্যাজমা, অ্যালার্জি, সিওপিডি (ক্রণিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ), সিওএডি (ক্রণিক অবস্ট্রাকটিভ আর্টারিও ডিজিজ), কোমা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে, প্রচলিত চুলায় রান্নার সময় যেদিক দিয়ে বাতাস আসে অর্থাৎ বাতাসের সাহায্যে ধোঁয়া আসে তার বিপরীতে বসে রান্না করা ভাল। চুলা থেকে যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে রান্না সারতে হবে। এসময় নাকমুখ শাড়ির আঁচল, গামছা, তোয়ালে দিয়ে ভালভাবে পেঁচিয়ে নিতে হবে কিংবা মাস্ক পরতে হবে। ধোঁয়াজনিত স্বাস্থ্যসমস্যার এহেন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা (জিআইজেড) যৌথভাবে 'বন্ধুচুলার বাজার উন্নয়ন উদ্যোগ' শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করে। এ চুলায় উৎপন্ন ধোঁয়া চিমনি দিয়ে রান্নাঘরের বাহিরে যায় এবং জ্বালানি খরচও অর্ধেক। তাছাড়া, জ্বালানি কতোটা শুকনো তার উপরও নির্ভর করে ধোঁয়া উৎপন্নের পরিমাণ। অন্যদিকে, কেরোসিন ল্যাম্পও আমাদের জন্য ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইডসহ আরো অনেক বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণ করে। সাধারনতঃ সন্ধায় কাচা বাজারে বা মাছ বাজারে কেরোসিনের ল্যাম্প নাকের ডগায় রেখে কেনাবেচা করতে দেখা যায়। আমাদেরকে কেরোসিনের ল্যাম্পও এড়িয়ে চলতে হবে এবং নাকেমুখে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। দেয়ালের চুনকাম :: দেয়ালের চুনকাম স্থানীয় বায়ুদূষণ (মাইক্রো এয়ার পলিউশন) ঘটায়। বিশেষ করে, পুরাতন বাড়ি অথবা দীর্ঘদিন ধরে যে সমস্ত বাসাবাড়ি রং করা হয়নি কিংবা বাড়ির দেয়াল বৃষ্টির পানিতে স্যাঁতস্যাঁতে বা ড্যাম হলে চুনকাম দেয়াল থেকে উঠে আসে এবং স্থানীয়ভাবে বায়ুতে দূষক কণার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরে অবস্থানকারী শ্বাসকষ্টের রোগী, শিশু ও বৃদ্ধরা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থপুষ্ট আইপেনের সহযোগিতায় ২০১০ সাল থেকে এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) বাসাবাড়ির বা শোভাবর্ধনকারী রং -এ বিপদজনক মাত্রার (৯০ পিপিএম -এর বেশি) সীসা নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে। শিশুদের মানসিক ও আচরণগত উন্নতিতে বাধাগ্রস্ত হয় ; এমনকি গর্ভজাত শিশুও (মায়ের সীসা আক্রান্তে) বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মে। আবার, ঘরের দেয়ালে পেরেক বা ড্রিল করার সময়ও প্রচুর ধুলাবালির সৃষ্টি হয়। এসময় ঘরে অবস্থানকারী সকলের মাস্ক পরা উচিত এবং শ্বাসকষ্টের রোগী, শিশু ও বৃদ্ধরা যেন ঘরে অবস্থান না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দুর্গন্ধ :: দুর্গন্ধ উৎপাদনকারী বস্তু এবং কার্যক্রম আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের যেন একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এই দুর্গন্ধ প্রতিনিয়ত ঘরে বাইরে বায়ুর গুনগতমান নষ্ট করছে। দুর্গন্ধের কারণে চরম স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়। কিছু কেমিকেলের প্রচন্ড দুর্গন্ধ চোখ, নাক, শ্বাসতন্ত্রে এবং ফুসফুসে জ্বালাযন্ত্রণার (Irritation) সৃষ্টি করে। কফিং, হুইজিং ও অন্যান্য শ্বাসজনিত সমস্যা সৃষ্টি করে। যারা দীর্ঘদিন দুর্গন্ধযুক্ত কর্ম পরিবেশে (Fertilizer, Pesticides, Poultry, Tannery, Tobacco, Garbage etc.) নিয়োজিত তাদের আচরণে (Mood, Anxiety and Stress level) আমুল পরিবর্তন ঘটে। আমাদের ঘরের ময়লা আবর্জনা এবং সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা দুর্গন্ধের অন্যতম উৎস। তাছাড়া পোল্ট্রি শিল্পের লিটার এবং পোল্ট্রি প্রক্রিয়াকরণের উচ্ছিষ্টাংশও দুর্গন্ধের আরেকটি বড় উৎস। আমাদের জন্য সমস্যার প্রধান কারণ হলো- সংশ্লিষ্টরা এসব আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে রাখেন, বিশেষ করে রাস্তার পাশে সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ফেলে রাখা হয়- যা জনপথ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকীস্বরূপ। বায়ুজাত অন্যান্য দূষককণা যেমন- মোল্ড স্পোরস, পেট ড্যানডার, স'ডাস্ট, অ্যারোসল, ফিউমস ইত্যাদিও স্বাস্থ্যসমস্যায় ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। এসমস্ত বায়ুজাত দূষককণা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের 'থ্রি জিরো টার্গেট' অনুসরণ করা উচিত। থ্রি জিরো টার্গেট হলো- জিরো পলিউশন (শূন্য দূষণ), জিরো কনজেশন (শূন্য যানজট) এবং জিরো এক্সিডেন্ট (শূন্য দূর্ঘটনা)। ২০৩০ সালের মধ্যে এই টার্গেট অর্জনে ইন্দোনেশিয়ার বালি সম্মেলনে অ্যাভয়েড (এড়িয়ে চলা), শিফট (রেল ও নদীপথে স্হানান্তর) ও ইমপ্রুভড (সালফারবিহীন মানসম্মত জ্বালানি ব্যবহার) করতে বলা হয়েছে। সেই সাথে প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে মাস্ক পরতে হবে এবং মাস্ক ব্যবহারকে জনপ্রিয় করতে সবাইকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে সচেতনতা বাড়াতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বার্নাড স্টুয়ার্ড বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলেছেন, 'প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসারের মূল কারণের মধ্যে বায়ুদূষণ তথা ধুলাবালি ও ধোঁয়া অন্যতম'। আর এই প্রতিরোধকল্পে ধুলাবালি ও ধোঁয়াতে আমাদের মাস্ক পরা কী উচিত নয় ? কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলাম ফাউন্ডার এন্ড চেয়ারম্যান মাস্ক ফাউন্ডেশন www.maskfoundation.com maskfoundation6767@gmail.com Published in : THE WEEKLY GONOBIPLOB 19-06-2016 Visit : www.gonobiplob.com

Leave a Comment