মাস্ক কেন ব্যবহার করবেন

সার্জেন্ট (অব:) আতাউর রহমান ।।

কেস স্ট্যাডি :
অতি অল্প বয়সেই ময়ূরী বেগম (ছদ্মনাম) আর চোখে দেখেন না। যতটুকু দেখেন তাও কিছুটা আলো ছায়ায় মিশে যায়। ঝাপসা ঝাপসা দেখেন আর কি। খালি চোখে বইয়ের অক্ষরগুলো পড়ে দেখবার ক্ষমতা হারিয়েছেন অনেক আগেই। এখন চোখে চশমা লাগিয়ে কোন রকমে কাজ চালিয়ে নেন। কেন এমন হলো তা ময়ূরী বেগম নিজেও জানেন না। আগ বাড়িয়ে কেউ তাকে সচেতনও করেননি। সদরে ডাক্তার দেখিয়েছেন। ডাক্তারি রিপোর্ট অনুসারে, অনেকটা দেরি করে ফেলেছেন ময়ূরী বেগম। আবারো সেই একই প্রশ্ন- কেন এমনটি হলো ? ডাক্তার বলেছেন, কাঠ কয়লার চুলার ধোঁয়াই নাকি কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ময়ূরী বেগমের। চোখের সমস্যার পাশাপাশি শ্বাসতন্ত্রও ধোঁয়ার কবল থেকে নিরাপদ নয়। এই শ্বাসতন্ত্রকে রক্ষার জন্য আমাদের সকলের মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।

মাস্ক কি?
আমাদের দেশে মাস্ক বা মুখোশ বলতে ছোট্ট এক টুকরো কাপড়কে বোঝায় যা নাক ও মুখ ঢেকে নেওয়ার জন্য ফিতা কিংবা ইলাস্টিকের মাধ্যমে কানে জড়ানো হয়। এটিকে এয়ারলুপ ডাস্টমাস্ক বলে। এটিই জনপ্রিয়, অন্য কোনপ্রকার ডাস্টমাস্ক সাধারণতঃ আমাদের দেশে তেমন সহজলভ্য নয়। এই একটি ছোট্ট মাস্কের গুরুত্ব এতো বেশি যে যারা মাস্ক পরেন না, তারা হয়তো এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনুধাবন করতে পারেন না। মাস্ক কোন বিলাসিতার বিষয় নয় বরং মাস্ক হতে পারে আপনার স্বাস্থ্যরক্ষার একটি বড় উপকরণ।

মূলকথা :
রান্না ঘরে ধোঁয়ার হাত হতে রক্ষা পেতে মাস্ক ব্যবহার করুন। তাতে ফুসফুসে বিষাক্ত ধোঁয়া প্রবেশ করবে না। এক্ষেত্রে মেয়েরা শাড়ির আঁচল, ওড়না, তোয়ালে, গামছা কিংবা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে নাকমুখ ঢেকে নিতে পারেন। কাঠ কয়লার চুলা থেকে নির্গত ধোঁয়া চোখেরও ক্ষতি করে। সেজন্য রান্নার সময় বাতাসের সাহায্যে চুলার ধোঁয়া যেদিক দিয়ে আসে, তার বিপরীতে বসে রান্না করা ভাল। সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি’র এক তথ্যমতে, কাঠ-কয়লার ধোঁয়া স্বাস্থ্যসমস্যার জন্য এক বিরাট হুমকিস্বরূপ। রান্না ঘরের কালি ও ঝুলে বিষাক্ত সূক্ষ্মকণা বা পার্টিকেল ম্যাটার (>২.৫~১০ মাইক্রণ) থাকে যা সহজেই শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে। এক্ষেত্রে মাস্ক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। আমাদের নিত্যদিনের কাজে ঘরের মধ্যেও প্রচুর ধুলাবালি জমা হয়। বিশেষ করে ঘরের কার্পেটে প্রচুর ধুলাবালি জমে ও মাইট নামক একপ্রকার অতিক্ষুদ্র অর্থোপড জীবাণু বাস করে। যাদের ঘরে কার্পেট আছে, তারা কার্পেট ও বিছানাপত্র পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করবেন। এতে বায়ুবাহিত জীবাণু বহনকারী ধুলাবালি ও মাইটের সমস্যা থেকে রক্ষা পাবেন। যার ফলশ্রুতিতে আপনি অ্যালার্জি, অ্যাজমা, হাঁচি, কাশি, কফ, ব্রংকাইটিস, সিওপিডি (ক্রণিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ) বা শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি স্বাস্থ্যসমস্যা হতে কিছুটা হলেও মুক্ত থাকবেন।

কৃষাণী যখন তাদের ফসলাদী ঘরে তোলার কাজ করবেন, তখন অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করবেন। কেননা, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই, বাছাই, সর্বোপরি শস্য প্রক্রিয়াকরণেও প্রচুর ধুলাবালি উৎপন্ন হয়। চাষি তার জমিতে কীটনাশক স্প্রে করার সময়ও মাস্ক ব্যবহার করবেন কারণ বাতাসের মাধ্যমে বিষের প্রভাব যাতে ফুসফুসে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য মাস্ক পরা অতি জরুরী।

আবার শীতের আবহাওয়ায় অধিক কুয়াশা থাকায় বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত স্বাস্থ্যসমস্যার প্রভাব বেশি দেখা দেয়। তাই সর্দি, হাঁচি, কাশি এড়িয়ে চলতে মাস্ক পরুন। মাস্ক পরলে এসব রোগের জীবাণু ভাইরাস সহজে বাতাসে ছড়াতে পারে না। ফলে অফিস আদালত, স্কুল ও কমিউনিটি প্লেসে সহজেই একজন হতে অন্যজনে ভাইরাসের আক্রমণে বাধা দেয় মাস্ক। আবার শীত ও বসন্ত এই দুই ঋতুর আবহাওয়ায় জলীয়বাষ্প অনেক কম থাকায় সামান্য বাতাসেই জৈব ও অজৈব ধুলাবালি উড়তে থাকে যা অনেক ক্ষতিকারক জীবাণু বহন করে। তাই এই জীবাণুর হাত হতে রক্ষা পেতে- আপনার স্বাস্থ্য সুস্থ রাখতে শিশু-বৃদ্ধসহ সকলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।

এ প্রসঙ্গে মাস্ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, যেকোন ধরণের কীটনাশক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কীটনাশক স্প্রে করার সময় মাস্কসহ অন্যান্য পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুয়েপমেন্ট) ব্যবহার করতে হবে। সম্প্রতি বড়বিলনালাই গ্রামে জনৈক চাষীর ছেলের মৃত্যু প্রসঙ্গ টেনে কৃষিবিদ ইসলাম বলেন, কীটনাশক অবশ্যই শিশু, বৃদ্ধসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের নাগালের বাহিরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে নিরাপদ সিপিএ বক্সে (প্লান্ট প্রোটেকশন এজেন্ট বক্সে) রাখা যেতে পারে।

Leave a Comment