”বিষ বিশুদ্ধ এবং আমরা”

কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলাম :
যখন অপরিকল্পিত উৎপাদন ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে একটি সমাজ, গোষ্ঠী, দেশ কিংবা জাতি অগ্রসর হয় তখন কোননা কোন একসময় ঐ সমাজ, গোষ্ঠী, দেশ, জাতি তথা সমগ্র পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। পরিবেশ ও প্রতিবেশের এই অপূরণীয় ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া তখন খুব কষ্ট সাধ্য হয়ে দাাঁড়ায়। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল পৃথিবীব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে। এই মৌলিক চাহিদার অনেকটাই পূরন হয়েছে বটে তবে কিছু কিছু যৌগিক সমস্যারও জন্ম দিয়েছে।  শিল্পবিপ্লবের চাকা ঘুরেছে- সাথে সাথে পরিবেশ দূষণের মাত্রাও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। তীব্রতর হয়েছে পরিবেশের সামগ্রীক অবক্ষয়, প্রতিবেশের সংকটাপন্ন টিকে থাকা, জলবায়ুর নানামূখী পরিবর্তন- তীব্রতর হয়েছে খরা, বন্যা, টর্ণেডোর মত প্রাকৃতিক দূর্যোগ। একদিকে ঘটেছে জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর মহোৎসব অন্য দিকে কার্বন সমৃদ্ধ হয়েছে সমস্ত ভূ-মন্ডল ও আয়নমন্ডলে। যখন এই কার্বন সমৃদ্ধের মাত্রা হয়েছে অস্বাভাবিক তখন ১৯৯৭ সাল। কিয়োটা সম্মেলনে টনক নড়ে বিশ্বমোড়লদের-নির্ধারন হয় গ্রীণ হাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা ১৯৯০ সালে যে শতাংশে পৌঁছেছিল তার থেকে ৫.২ শতাংশ হ্রাস করার অঙ্গিকার। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বালি সম্মেলনে উত্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের তুলনায় বায়ুমন্ডলে কার্বনের মাত্রা মোটেই হ্রাস পায়নি বরং বেড়েছে ২৫ শতাংশ। যা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে গোটা বিশ্বকে। এই ভয়াবহ মাত্রায় কার্বন দূষণের জন্য দায়ী মাত্রাতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার, শিল্পবর্জ্য, রিফ্রিজারেশন, এয়ারকন্ডিশন, ফোম, এরোসল ও সলভেন্ট সেক্টরে সিএফসি (ক্লোরোফ্লোরোকার্বন) এবং এইচসিএফসি (হাইড্রোক্লোরোফ্লোরোকার্বন) ব্যবহার, কোয়ারেন্টাইন, ফিউমিগেশন, কীটনাশকে মিথাইল ব্রোমাইডের ব্যবহার, বননিধন, কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত সার প্রয়োগ ইত্যাদি। কার্বন বিষায়নের এই প্রতিযোগীতায় চীন বিশ্বের প্রথম স্থান ধরে রেখেছে। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলিতভাবে বিশ্বের ৪৫ শতাংশ কার্বন বিষায়নের জন্য দায়ী। চীনের শীর্ষস্থানীয় আবহাওয়া বিজ্ঞানী ও আবহাওয়া প্রশাসনের প্রধান ঝাং গুয়াগং দেশটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ানক প্রভাবের আশংকা করে বলেন, ‘এর ফলে চীনে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে। বড় ক্ষতি হতে পারে পরিবেশেরও। বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারের চেয়ে চীনে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ইতিমধ্যে অনেক বেশী।’ কার্বন বিষায়নের দিক দিয়ে তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র ভারত। আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় এই যে, বাংলাদেশ ভারতের বাউন্ডারী এবং চীন ও ভারতের ট্রান্সবাউন্ডারীভূক্ত দেশ। দূষণের এই প্রভাব থেকে আমরা মোটেও নিরাপদ নই।

আমাদের বাসযোগ্য পরিবেশের জন্য এই পৃথিবীর ফুসফুস বলতে বনভূমিকেই বুঝায়। অথচ সমগ্র পৃথিবী  থেকে প্রতি বছর প্রায় ১৫ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি উজাড় হচ্ছে শুধুমাত্র বন নিধনের কারনে। সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর ২ বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরনের ঘটনা ঘটছে। ফলে এখানে সেখানে এসিড বৃষ্টির মত ঘটনা অহরহ ঘটেই চলেছে। এই একই কারনে সমুদ্রের পানির লবনাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। স্টীল প্রোডাকশনের কারনে গ্রীণ হ্উাস গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে বছরে ৪ হাজার মিলিয়ন টন। উন্নত পদ্ধতি (এইচএইচকে, টিকে, জিগজ্যাগ) গ্রহণ না করায় শুধুমাত্র বাংলাদেশের ইটভাটা হতে বছরে ৮ মিলিয়ন টন কার্বন বাতাসে মিশছে। তবে আমাদের জন্য আশার বাণী এই যে, পরিবেশ অধিদপ্তরের গৃহীত পদক্ষেপে ইতিমধ্যে প্রচলিত বায়ু দূষণকারী প্রায় ২১৪১টি ইটভাটাকে আধূনিক ও উন্নত পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে। বাংলাদেশের শহরগুলোতে প্রায় ৪.৮৬ মিলিয়ন টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। বৃদ্ধির এই হার অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সাল নাগাত অশোধিত বর্জ্যের পরিমাণ ১৭.২ মিলিয়ন টনে পৌঁছতে পারে। এই অশোধিত বর্জ্য হতে প্রতিনিয়ত বায়ূ, পানি, মৃত্তিকা দূষিত হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে বেঁচে থাকবার পরিবেশ ও প্রতিবেশ। সম্প্রতি সরকার অতি উৎসাহের সাথে মেট্রোপলিটন সিটিতে থ্রি-আর (রিডিউস-রিইউজ-রিসাইক্লিং) পদ্ধতিতে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগী হয়েছে। তবে অশোধিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিধি আরো বাড়াতে হবে। জোরদার করতে হবে ‘পলুটারস পে প্রিন্সিপ্যাল’ । পরিবেশ ও প্রতিবেশ দূষণের এই বিষাক্ততা পরিহার করে বিশুদ্ধতার পথে চলতে হবে। অতিসম্প্রতি দূর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য নিয়ে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে চলছে ‘গার্বেজ মুভমেন্ট।’ সচেতন বৈরুতবাসী বর্জ্যের দূর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে (মাত্র ২০ হাজার  টনে পৌঁছায়) রাস্তায় নেমেছে। আমরা এখনো বর্জ্যরে দূর্গন্ধে নিরবে নাক চেপে পথ পার হয়েই চলেছি।

কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত সার, কীটনাশক প্রয়োগ, কোয়ারেন্টাইন, ফিউমিগেশনের ফলে সামগ্রীকভাবে মাটি, পানি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ প্রতিনিয়ত বিষায়নের শিকার হচ্ছে। মাটিতে কীটনাশকের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব (পপস্-পারসিস্টেন্ট অর্গানিক পলুটেন্টস) মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এলড্রিন, ক্লোরডেন, ডিডিটি, ডিএলড্রিন, এনড্রিন, হেপ্টাক্লোর, হেক্সাক্লোরোবেনজিন, মিরেক্স, টক্সাফেন কীটনাশক সুইজারল্যান্ডের স্টকহোম কনভেনশনে প্রাথমিকভাবে ‘ডার্টি ডজেন’ হিসাবে পপস্ এর অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এইগুলো এতটাই বিষাক্ত যে, বছরে পর বছর কিংবা যুগ যুগ ধরে মাটিতে অবস্থান করে। ফলে মানুষ এবং বন্যপ্রাণী উভয়েই বিষাক্রান্ত হয়। যেমন ক্যান্সার, এলার্জি, হাইপারসেন্সিটিভিটি, সেন্ট্রাল এন্ড পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেমে ব্যাঘাত, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং ইমুনাইজেশনে বাঁধার সৃষ্টি করে। এমনকি হরমোনাল সিস্টেমে পরিবর্তন ঘটিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বৃদ্ধির বিকাশে বাঁধা এবং কারসিনোজেনিক ইফেক্ট সৃষ্টি করে। সম্প্রতি বুয়েটের এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে, আশুলিয়ার পানিতে বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ডের (বিওডি) সহনীয় মাত্রা যেখানে লিটার প্রতি ৫০ মিলিগ্রাম থাকার কথা সেখানে পাওয়া গেছে ৬০০ মিলিগ্রাম। আর পানিতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (সিওডি) যেখানে লিটার প্রতি ২০০ মিলিগ্রাম হওয়ার কথা সেখানে পাওয়া গেছে ৯৯৪ মিলিগ্রাম। শিল্পবর্জ্যের কারনে পানিতে সালফায়েড মিশছে যা পরবর্তীতে বাষ্পীয়রূপে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে, স্থানীয়ভাবে ঘর-বাড়ীর টিন ও অন্যান্য ধাতব সামগ্রীতে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে মরচে ধরছে। তা’হলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী এবং অনুজীবের তথা সামগ্রীক প্রতিবেশের কি অবস্থা ? বিশেষজ্ঞরা বলেছেন- মানুষের ফুসফুস, যকৃত ও কিডনি আক্রান্তের ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে গেছে। ভাবতে কষ্ট হয়, আমরা আজ আর দেশী মাছ চোখে দেখি না। টাকি, বাইম, মাগুর, শিং এখন অভিজাত পরিবারের খাবার। একসময় চাষ করা মাছ (রুই, মৃগেল, কার্প) ছিল অভিজাত খাবার মেনুর দখলে। বিষের প্রকৃতি ও প্রভাব এতোটাই বেড়ে গেছে যে, মাছের ডিম ফুটাবার পানি নেই- যা আছে তা বিষাক্ত, এমনিতেই ডিম নষ্ট হয়ে যায়। এই আদরের মাছকে ‘পকেট মানি’ দিয়ে ফ্রিজে পুরিয়ে রাখবেন। সেখানেও ঘটবে কার্বন দূষণ। বিষাক্ততা ছড়িয়ে পড়বে পরিবেশে। কার্বন বিষায়নের এই মারাত্মক প্রভাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ প্রতিবেশ তথা নিজেকেও করতে হবে বিশুদ্ধ। আমরা যদি আবারও ঝাং এর কথায় ফিরে যাই, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের অতীত এবং ভবিষ্যতের প্রতিবন্ধকতাগুলোর মুখোমুখি হতে গেলে আমাদের প্রকৃতিকে ভালবাসতে হবে। আর প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকেও সহাবস্থান করতে হবে। প্রকৃতিকে আমাদের প্রাধান্য দিতেই হবে। এর পাশাপাশি জলবায়ু নিরাপত্তার দিকে জোর দিতে হবে।’

পরিশেষে একথা অনস্বীকার্য যে, সমস্ত দূষণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। সমাজ, রাষ্ট্র, জাতি তথা ‘উইথআউট বাউন্ডারী’তে আমাদের দূষণ নিয়ন্ত্রনে ভূমিকা রাখতে হবে। দূষণ থেকে রক্ষা পেতে নিজেদেরকেও পিপিই(পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট) বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। যেমন মাস্ক, গ্লাভস, এ্যাপ্রোন, ফেসশিল্ড, গামবুট, গগলস্ ইত্যাদি পরিধান করতে হবে। বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, এসবেটস, ফিউমস, ধুলাবালি, মোলডস, স্পোর, পোলেন গ্রেইন, মাইটস্ ইত্যাদি থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক পরার পাশাপাশি পিপিই এর বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

7 Thoughts to “”বিষ বিশুদ্ধ এবং আমরা””

  1. editor

    Bismillahir Rahmanir Rahim. Beginning by the name of ALLAH.

  2. One of the most vital action is to validate the inside
    as well as outside demands of your home restoration job.

  3. I was curious if you ever considered changing the layout of your website?

    Its very well written; I love what youve got to say. But maybe
    you could a little more in the way of content so people could
    connect with it better. Youve got an awful lot of text for only having 1 or 2 images.
    Maybe you could space it out better?

  4. Good day! I just would like to give you a huge thumbs up for the excellent information you have got here on this
    post. I’ll be coming back to your blog for more soon.

  5. Wow, that’s what I was exploring for, what a information! present here at this
    webpage, thanks admin of this website.

  6. you are in point of fact a just right webmaster.

    The site loading speed is incredible. It sort of feels that
    you are doing any unique trick. Furthermore, The
    contents are masterwork. you have done a magnificent activity on this topic!

  7. Very great post. I just stumbled upon your blog and wished to mention that I’ve really
    loved surfing around your weblog posts. In any case I will be subscribing on your rss feed and I’m
    hoping you write once more soon!

Leave a Comment